

মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক চর্মরোগ হলো একজিমা (Eczema), যার চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় নাম অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস (Atopic Dermatitis)।
বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে এই রোগটি অত্যন্ত সাধারণ। জাতীয় চর্মরোগ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চর্মরোগ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে প্রায় ৩০-৪০% রোগীই কোনো না কোনো ধরনের একজিমায় আক্রান্ত। এটি ছোঁয়াচে নয়, কিন্তু বংশগত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে গভীরভাবে জড়িত।
একজিমা কী?
আমাদের ত্বকের সবচেয়ে বাইরের স্তরকে বলা হয় স্কিন ব্যারিয়ার। এটি ইটের দেয়ালের মতো কাজ করে – ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং বাইরের ধুলোবালি, জীবাণু, অ্যালার্জেনকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না। একজিমা রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যারিয়ারটি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ত্বক দ্রুত পানি হারিয়ে শুষ্ক হয়ে যায়, ফেটে যায় এবং বাইরের ক্ষতিকর পদার্থ সহজেই ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টি করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
একজিমা কয়েক প্রকারের হতে পারে:
১. অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস: সবচেয়ে পরিচিত। শিশুদের বেশি হয়, হাঁটু ও কনুইয়ের ভাঁজে, গালে, ঘাড়ে হয়।
২. কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস: কোনো বিশেষ জিনিসের সংস্পর্শে এলে হয়। যেমন – নকল গহনা, ডিটারজেন্ট, চামড়ার জুতা, রঙ।
৩. সেবোরিক ডার্মাটাইটিস: মাথার ত্বক, ভ্রু, নাকের পাশে তৈলাক্ত, হলুদ আঁশযুক্ত চুলকানি।
৪. ডিসহাইড্রোটিক একজিমা: হাত ও পায়ের আঙুলে ছোট ছোট পানিযুক্ত ফোসকা।
৫. নিউমুলার একজিমা: গোল গোল কয়েনের মতো ক্ষত।
রোগের কারণ
একজিমার কোনো একক কারণ নেই, এটি বহু কারণের সম্মিলিত ফল।
১. জেনেটিক বা বংশগত কারণ: এটি প্রধান কারণ। বাবা-মা দুজনেরই অ্যাজমা, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা একজিমা থাকলে সন্তানের একজিমা হওয়ার সম্ভাবনা ৭০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ফিলাগ্রিন (Filaggrin) নামক একটি প্রোটিনের জিন মিউটেশন এর জন্য দায়ী, যা ত্বকের ব্যারিয়ার তৈরিতে সাহায্য করে।
২. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি: শরীরের ইমিউন সিস্টেম অকারণে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়।
৩. পরিবেশগত ট্রিগার:
ধুলোবালি, ফুলের রেণু, পোষা প্রাণীর লোম
অতিরিক্ত গরম ও অতিরিক্ত ঘাম
শীতকালে অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়া
সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট, ব্লিচিং পাউডারে থাকা কড়া কেমিক্যাল
উল বা সিনথেটিক কাপড়
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা – স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল একজিমা বাড়িয়ে দেয়
খাদ্য অ্যালার্জি – কারও কারও ক্ষেত্রে গরুর দুধ, ডিম, বাদাম, সয়াবিন, ইলিশ মাছ, চিংড়ি, বেগুন ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, যদিও সবার ক্ষেত্রে নয়।
৪. ত্বকের শুষ্কতা: যাদের জন্মগতভাবে ত্বক শুষ্ক, তাদের একজিমার ঝুঁকি বেশি।
লক্ষণ বা উপসর্গ
তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে রাতে চুলকানি বেড়ে যাওয়া – এটি একজিমার প্রধান লক্ষণ।
ত্বক লালচে হয়ে ফুলে যাওয়া
ত্বক অত্যন্ত শুষ্ক, খসখসে ও আঁশযুক্ত হয়ে যাওয়া
ছোট ছোট ফোসকা বা গুটি, যা থেকে পানি বা কস বের হতে পারে
দীর্ঘদিন চুলকাতে চুলকাতে ত্বক মোটা, কালো ও চামড়ার মতো শক্ত হয়ে যাওয়া (Lichenification)
শিশুদের গালে, মাথায়, হাতে-পায়ে এবং বড়দের ঘাড়ে, কনুইয়ের ভাঁজে, হাঁটুর পেছনে বেশি দেখা যায়।
করণীয় ও প্রতিকার
একজিমা সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন, কিন্তু সঠিক যত্ন ও জীবনযাপনে একে ৯০% পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় – দৈনন্দিন যত্ন এবং ওষুধ।
ক) দৈনন্দিন যত্ন ও জীবনযাপন – এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
১. ময়েশ্চারাইজারই প্রধান ওষুধ: একজিমার চিকিৎসার মূলমন্ত্র হলো “ভেজাও এবং আটকে রাখো”। দিনে অন্তত ৩-৪ বার মোটা, সুগন্ধিমুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন যুক্ত ক্রিম, সেরামাইড যুক্ত ময়েশ্চারাইজার সবচেয়ে ভালো। গোসলের নিয়ম হলো – কুসুম গরম পানিতে ৫-১০ মিনিটের বেশি গোসল নয়, সাবান কম ব্যবহার করা, গোসল শেষ হওয়ার ৩ মিনিটের মধ্যে সারা শরীরে ময়েশ্চারাইজার লাগানো, যাতে পানি ত্বকে আটকে থাকে।
২. ট্রিগার চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলা: একটি ডায়েরি রাখুন। কোন খাবার, কোন সাবান বা কোন আবহাওয়ায় বাড়ছে তা লিখে রাখুন। ডিটারজেন্ট দিয়ে কাপড় ধোয়ার পর ভালো করে ধুয়ে নিন। নতুন কাপড় ধুয়ে পরুন। সুতির নরম, ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।
৩. চুলকানি নিয়ন্ত্রণ: নখ ছোট করে কেটে রাখুন। রাতে ঘুমের মধ্যে চুলকালে শিশুদের হাতে মোজা পরিয়ে দিন। চুলকানি হলেই চুলকাবেন না, বরং ঠান্ডা ভেজা কাপড় দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরুন বা বরফ সেঁক দিন। মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন, পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি।
৪. গোসল ও পরিষ্কারে সতর্কতা: ক্ষারযুক্ত সাবান, অ্যান্টিসেপটিক সাবান একদম নিষিদ্ধ। সিন্ডেট (Syndet) বা গ্লিসারিন বেসড সাবান ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বককে আরও শুষ্ক করে দেয়।
৫. খাদ্যাভ্যাস: প্রচুর পানি পান করুন। ভিটামিন-A, E, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন – গাজর, পালং শাক, সামুদ্রিক মাছ ত্বকের জন্য ভালো। তবে কোনো খাবারে অ্যালার্জি প্রমাণিত না হলে অযথা সব খাবার বাদ দেবেন না, এতে পুষ্টিহীনতা দেখা দেবে।
খ) চিকিৎসা – অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে
১. স্টেরয়েড ক্রিম: চিকিৎসক লালচে ও প্রদাহযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট মাত্রার স্টেরয়েড ক্রিম (যেমন হাইড্রোকর্টিসোন) দেন। এটি দ্রুত প্রদাহ কমায়। কিন্তু নিজে নিজে দীর্ঘদিন লাগালে ত্বক পাতলা হয়ে যায়, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না।
২. ক্যালসিনিউরিন ইনহিবিটর: ট্যাক্রোলিমাস, পাইমেক্রোলিমাস জাতীয় ক্রিম মুখ ও চোখের পাতার মতো সংবেদনশীল জায়গার জন্য নিরাপদ।
৩. অ্যান্টিহিস্টামিন: রাতের তীব্র চুলকানি কমাতে এবং ঘুমের জন্য চিকিৎসক অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট দিতে পারেন।
৪. সংক্রমণের চিকিৎসা: চুলকাতে চুলকাতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে।
৫. ফটোথেরাপি ও আধুনিক চিকিৎসা: দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল একজিমার ক্ষেত্রে UVB লাইট থেরাপি এবং নতুন বায়োলজিক ইনজেকশন (Dupixent) এখন বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঘরোয়া ভুল ধারণা থেকে সাবধান
গ্রামে অনেকেই একজিমাকে ছোঁয়াচে মনে করে বা নিম পাতা, চুন, ব্লিচিং দিয়ে ঘষে, যা ত্বককে আরও নষ্ট করে দেয়। কবিরাজি বা হোমিওপ্যাথিতে স্টেরয়েড মিশিয়ে তাৎক্ষণিক ফর্সা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা পরে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মনে রাখবেন, একজিমা কোনো অপরিষ্কার রোগ নয়, এটি একটি জিনগত প্রদাহ।
কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?
ক্ষত থেকে পুঁজ বা হলুদ কস বের হলে
জ্বর আসলে
সারা শরীর ফুলে গেলে বা চুলকানিতে ঘুম একেবারে না হলে
একজিমা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। একজন স্মার্ট রোগী সেই যে, রোগকে বোঝে, ট্রিগার এড়িয়ে চলে এবং প্রতিদিন নিয়ম করে ত্বকের যত্ন নেয়। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে ত্বকের সুস্থতাই আসল স্মার্টনেস। আপনার বা আপনার শিশুর যদি এই লক্ষণগুলো থাকে, তবে পরামর্শ নিন।
*চেম্বার ও যোগাযোগ*
(ডিইউএমএস, বিএসএস)
চিকিৎসক সরকারি রেজি. নং : 3546/A
ড্রাগ লাইসেন্স নাম্বার : CHA-3435 A/B.
চিকিৎসা কেন্দ্রের ঠিকানা
সততা প্লাজা, ইবনে সিনা হেলথ কেয়ার , প্লট নং ২৬, গাউছিয়া মডেল টাউন,
রামপুর বাজার (বলাখাল থেকে উত্তর দিকে), হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন : ইমো-হোয়াটসঅ্যাপ: 01762240650
চেম্বারের সময় : প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে ১২টা। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে চারটা। সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।*
আমাদের সেবাসমূহ : শ্বেতী রোগ, ডায়াবেটিস, যৌন রোগ, সোরিয়াসিস, দাদ, একজিমা, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, সিফিলিস, গনোরিয়া, থাইরয়েড, পাইলস-ফিস্টুলা, টিউমার, জরায়ু টিউমার, ব্রেস্ট টিউমার, পলিপাস, টনসিল, মেহ প্রমেহ, সাদা স্রাব (লিকোরিয়া), মেছতা, কিডনী পাথর, আঁচিল, ব্রণ, বন্ধ্যাত্ব, বিকল্প চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য’র চিকিৎসা।








